
স্কুলের ফুটবল টুর্নামেন্ট সামনে রেখে নিয়মিত প্র্যাকটিস করছিল রাজধানীর লালমাটিয়ার একটি ইংরেজি মাধ্যমের স্কুলের কয়েকজন ছাত্র। স্কুলসংলগ্ন মাঠে শিক্ষক তত্ত্বাবধানে চলা এই অনুশীলন শেষে কেউ কেউ সরাসরি কোচিং সেন্টারে যাচ্ছিল জার্সি ও হাফপ্যান্ট পরেই। সময় স্বল্পতার কারণেই পোশাক পরিবর্তন না করেই তারা ক্লাসে যোগ দিচ্ছিল।
গত বুধবার সন্ধ্যায় এমনই এক পরিস্থিতিতে হাফপ্যান্ট পরা অবস্থায় কোচিং ক্লাস শেষে বাড়ি ফেরার পথে হামলার শিকার হয় এক কিশোর (১৬)। সন্ধ্যা সাড়ে সাতটার দিকে ক্লাস থেকে বেরিয়ে কিছুদূর যাওয়ার পর পেছন থেকে মাথায় চাঁটি মারেন অচেনা দুই তরুণ। এরপর তারা মারমুখী হয়ে প্রশ্ন করে, কেন সে হাফপ্যান্ট পরেছে। কিশোর জানায়, ফুটবল প্র্যাকটিস শেষে সরাসরি কোচিংয়ে এসেছিল সে। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে দুই তরুণ গালাগালি শুরু করে এবং শারীরিকভাবে আক্রমণ করে।
ঘটনাটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তুলে ধরেন কিশোরের এক স্বজন। পরে কিশোরের মা পুরো ঘটনার বর্ণনা দেন। তিনি জানান, তাঁর ছেলে ধানমন্ডিতে বসবাসকারী পরিবারের নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী। হাফপ্যান্ট পরার মতো সাধারণ একটি কারণে ছেলের ওপর হামলার ঘটনা তাঁকে মানসিকভাবে ভেঙে দিয়েছে। ঘটনার পর থেকে তাঁর ছেলে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে।
কিশোরের মা বলেন, ঘটনার দিন দুপুরে বাসা থেকে বের হয়ে ছেলে বিকেল ৩টা থেকে ৫টা পর্যন্ত ফুটবল প্র্যাকটিস করে। এরপর বিকেল ৫টা থেকে সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত কোচিং ক্লাস ছিল। কোচিং শেষে গাড়িতে ওঠার সময়ই হামলার শিকার হয় সে। হামলাকারীদের একজন জার্সির কলার ধরে জোরে টান দিলে কিশোরের গলায় দাগ পড়ে যায়। আরেকজন মারতে উদ্যত হলে কিশোর প্রতিরোধ করে দৌড়ে পালানোর চেষ্টা করে। এ সময় অন্য ছাত্ররা বেরিয়ে এলে হামলাকারীরা পালিয়ে যায়।
ছেলে ফোন করলে তার বাবা দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছান, তবে ততক্ষণে হামলাকারীরা পালিয়ে যায়। কিশোরের বাবা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ধানমন্ডিতে জন্ম ও বেড়ে ওঠা হলেও এত বছর ধরে এমন ঘটনা কখনো দেখেননি।
ঘটনার পর পরিবারটি আতঙ্কে রয়েছে। কিশোরের মা জানান, এখন ছেলেকে ফুটবল প্র্যাকটিসে পাঠানোর সময় ব্যাগে অতিরিক্ত পাজামা দিয়ে দিতে হচ্ছে। তাঁর ছেলে বাবাকে প্রশ্ন করেছে, ‘হাফপ্যান্ট পরা কি অপরাধ?’
এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মনিরুল আই খান বলেন, দেশে একটি উদ্বেগজনক সাংস্কৃতিক পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। আধিপত্যবাদী ও বলিষ্ঠ গোষ্ঠী নিজেদের পছন্দ অন্যের ওপর জোর করে চাপিয়ে দিতে চাইছে। তিনি বলেন, পোশাক নিয়ে এ ধরনের জোরজবরদস্তি সামাজিক অসহিষ্ণুতার বহিঃপ্রকাশ এবং এটি গণতান্ত্রিক পরিবেশের জন্য মারাত্মক হুমকি।
অধ্যাপক মনিরুল খান আরও বলেন, ভিন্ন মত ও জীবনাচারের প্রতি সহনশীলতা না থাকলে সমাজে সংকট তৈরি হয়। এ ধরনের ঘটনার বিরুদ্ধে সরকার ও সমাজ—উভয়কেই দৃঢ় ভূমিকা নিতে হবে।